Breaking News
Home / অর্থনীতি / গলাচিপায় আউশ ধান চাষে কৃষকদের লোকসান ১০ কোটি

গলাচিপায় আউশ ধান চাষে কৃষকদের লোকসান ১০ কোটি

জসিম উদ্দিন, গলাচিপা, (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা
পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলায় ঋণের ও লোকসানের বোঝা নিয়ে কৃষকরা এখন দিশেহারা। এ অঞ্চলে শতকরা ৯০ জন লোক কৃষির উপর নির্ভরশীল। বেশিরভাগ কৃষকরাই দরিদ্র সীমার নিচে বসবাস করছেন। সাগর পাড়ের এ উপজেলাটি বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন ঝড়, অতিবৃষ্টি , অনাবৃষ্টি সহ বৈরি আবহাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি এলাকা। ফলে প্রান্তিক কৃষকরা প্রতিবছরই কোন না কোন ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছেন। এর পরেও উপজেলার স্থানীয় ধান ব্যবসায়ী ও আড়ৎদারদের স্থানীয় মাপঝোপের সিন্ডিকেটের কারণেও কৃষকরা বেশি লোকসানের কবলে পড়ছেন। এ যেন গোঁদের উপর বিষফোড়। সরকার কর্তৃক সারা দেশে যেখানে ৪০ কেজিতে মণ ধরা হয়, সেখানে এ উপজেলায় বস্তাসহ ৫০ কেজিতে মণ ধরা হয়।এতে করে ধান ব্যবসায়ী ও আড়ৎদাররা কৃষকদের কাছ থেকে মণ প্রতি ৮ কেজি ধান বেশি নেওয়ায় কৃষকরা ব্যাপক লোকসানের সম্মুখিন হচ্ছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের কোথাও এ ধরনের মাপঝোপের কোন প্রচলন নেই। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থ বছরে আউশ ধান চাষে উপজেলায় মোট ৬ হাজার হেক্টর জমি আবাদ হয়। এর মধ্যে উচ্চ ফলন শীল (উফশী) পদ্ধতিতে ৫ হাজার ৫০০হেক্টর ও স্থানীয় পদ্ধতিতে ৫০০ হেক্টর জমি আবাদ করা হয়। প্রতি হেক্টর জমি চাষাবাদে খরচ হয় – বীজে ১৫০০ টাকা, ইউরিয়া সারে ২০৮০ টাকা, টিএসপি সারে ১৭৬০ টাকা, এমওপি সারে ৭৫০ টাকা, দস্তা সারে ৭৫০ টাকা, জিপসাম সারে ২০০ টাকা, কীটনাশকে ২৫০০ টাকা,বীজতলা তৈরিতে ১৩৫০ টাকা, জমি তৈরিতে ৯০০০ টাকা, বীজ রোপনে ৯০০০ টাকা, সার প্রয়োগে মজুরী ৯০০ টাকা, আগাছা পরিষ্কারে ৫০০ টাকা, ক্ষেতে পানি দেয়া ও নিষ্কাশনে ৯০০ টাকা, কীটনাশক প্রয়োগে মজুরী ১৩৫০ টাকা, ধান কেটে বাড়ি আনতে মজুরী ৯০০০ টাকা, মাড়াইতে মজুরী ২৭০০ টাকা, জমির লিজ বাবদ ৩২০০০ টাকা। কৃষকদের হেক্টর প্রতি খরচ হয় ৭৬ হাজার ২৪০ টাকা। কৃষকদের উফশী পদ্ধতিতে খরচ হয় ৪১ কোটি ৯৩ লক্ষ ২০ হাজার টাকা এবং স্থানীয় পদ্ধতিতে খরচ হয় ৩ কোটি ৮১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা। কৃষকদের উফশী ও স্থানীয় পদ্ধতিতে আউশ চাষে সর্বমোট খরচ হয় ৪৫ কোটি ৭৪ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা। উফশী পদ্ধতিতে হেক্টর প্রতি ৫ টন ও স্থানীয় পদ্ধতিতে হেক্টর প্রতি ৪ টন ধান উৎপন্ন হয়। উফশী পদ্ধতিতে ২৭ হাজার ৫০০ টন ও স্থানীয় পদ্ধতিতে ২ হাজার টন সর্বমোট ২৯ হাজার ৫০০ টন ধান উৎপন্ন হয়। বর্তমানে স্থানীয় ধানের গড় বাজার দর মণ প্রতি ৬০০ টাকা। ৪০ কেজিতে মণ ধরা হলে সে হিসেবে উৎপাদিত ধানের মূল্য দাড়াত ৪৪ কোটি ২৫ লক্ষ টাকা। এতেও কৃষকদের ১ কোটি ৪৯ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা লোকসান হয়। আর বর্তমানে কৃষকরা স্থানীয় মাপঝোপের কারণে উৎপাদিত ধানের মূল্য পাচ্ছেন ৩৫ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা। স্থানীয় এই মাপঝোপের সিন্ডিকেটের কারণে কৃষকদের অতিরিক্ত লোকসান হয় ৮ কোটি ৮৫ লক্ষ টাকা। সর্বমোট আউশ চাষে বছরে কৃষকদের লোকসান হয় ১০ কোটি ৩৪ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা। চলতি আমন মৌসুমে মোট ৩৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আমন ধান আবাদ হয়। এর মধ্যে উফশী পদ্ধতিতে ২২ হাজার ৫০০ হেক্টর ও স্থানীয় পদ্ধতিতে ১১ হাজার হেক্টর জমি আবাদ হয়। এতে উফশী পদ্ধতিতে ১ লক্ষ ১২ হাজার ৫০০ টন ও স্থানীয় পদ্ধতিতে ৪৪ হাজার টন সর্বমোট ১ লক্ষ ৫৬ হাজার ৫০০ টন আমন ধানের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যদি ধান ব্যবসায়ী ও আড়ৎদারদের স্থানীয় এ মাপঝোপের সিন্ডিকেট অব্যাহত থাকে তাহলে প্রান্তিক কৃষকদের আমনেও ৬৭ কোটি ৬০ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এখন উফশী আমন ধান বের হওয়া শুরু হয়েছে। অসময়ে বৃষ্টির কারনে রাতে আমন ধানের মুকুলের ভিতরে পানি প্রবেশ করে চিটা হয়ে যায়। এতে আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে করে প্রান্তিক কৃষকরা কৃষিকাজে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। একদিকে কৃষকরা ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, অপরদিকে এলাকার ধান ব্যবসায়ী ও আড়ৎদারদের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ক্রয় ও মাপঝোপের ত্রুটির কারণেও কৃষকরা লোকসানে পড়ছেন। এ ব্যাপারে গোলখালী ইউনিয়নের নলুয়াবাগী গ্রামের প্রান্তিক কৃষক মো. নুরুজ্জামান হাওলাদার এ প্রতিবেদককে বলেন, আমি এক কানি (২.৫ একর) জমিতে উফশী পদ্ধতিতে আউশ ধান চাষ করেছি। এতে আমার মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৭৫ হাজার টাকা। ধান বিক্রি করে আমি পেয়েছি ৬৩ হাজার টাকা। আমার ১২ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এ.আর.এম সাইফুল্লাহ জানান, সরকার ভর্তুকিমূল্যে বিভিন্ন প্রকারের সার, কৃষি যন্ত্রপাতি কৃষকদের মধ্যে সরবরাহ করছে এবং আরও কিছু কৃষি যন্ত্রপাতি বিনামূল্যে কৃষকদের মধ্যে সরবরাহ করছে। তাছাড়া প্রণোদনার মাধ্যমে সরকার ক্ষুদ্র প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে সার ও বীজ বিতরণ করছে। এমনকি সরকার ধানের পরিচর্যা খরচ বাবদ নগদ টাকাও ওই প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে বিতরণ করছে।

Check Also

গলাচিপায় কলেজ ছাত্রীর মৃত্যুতে ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা

জসিম উদ্দিন, স্টাফ রিপোর্টার পটুয়াখালীর গলাচিপায় শিল্পী আক্তারের মৃত্যুতে গলাচিপা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে মামলা …