Breaking News
Home / সারাদেশ / বরিশাল / পটুয়াখালী / গলাচিপার মানচিত্র পাল্টে যাচ্ছে পঞ্চ নদীর ভাঙণে

গলাচিপার মানচিত্র পাল্টে যাচ্ছে পঞ্চ নদীর ভাঙণে

জসিম উদ্দিন, গলাচিপা (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা
বঙ্গোপসাগর ঘেঁষা পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলা। একটি পৌরসভা ও বারটি ইউনিয়ন নিয়ে উপজেলাটি গঠিত। ইংরেজী ২০১৫ সনের আদম শুমারী অনুযায়ী উপজেলার মোট লোকসংখ্যা তিন লক্ষ একষট্টি হাজার পাঁচশত আঠার জন ও আয়তন এক হাজার দুইশত সাতষট্টি দশমিক আট নয় বর্গ কিলোমিটার। লোহালিয়া, রামনাবাদ, আগুনমুখা, বুড়াগৌরাঙ্গ ও তেঁতুলিয়া নদীবেষ্টিত নৈসর্গিক সৌন্দর্যমন্ডিত এ উপজেলা। নদীগুলো বঙ্গোপসাগরের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। পৌরসভা বাদে সবক’টি ইউনিয়নের নদী তীরবর্তী শত শত গ্রামের হাজার হাজার পরিবারের প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষ লোহালিয়া, রামনাবাদ, আগুনমুখা, বুড়াগৌরাঙ্গ ও তেঁতুলিয়া নদীর অব্যাহত তীব্র ভাঙণের ফলে আতংকে দিন কাটাচ্ছেন। বঙ্গোপসাগরের প্রধান শাখা আগুনমুখা নদী। আগুনমুখার তিনটি শাখার একটি রামনাবাদ, একটি বুড়াগৌরাঙ্গ ও অপরটি তেঁতুলিয়া। রামনাবাদর একটি শাখা লোহালিয়া। এ পঞ্চ নদীর ভাঙণের তান্ডবলীলায় নদীগর্ভে বিলীন হতে যাচ্ছে এ উপজেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত জীববৈচিত্র্য, কৃষিসমৃদ্ধ ও মৎস্যসমৃদ্ধ এলাকার হাজার হাজার পরিবারের ঘর-বাড়ি, হাজার হাজার একর মূল্যবান আবাদি জমি, গাছ-পালা, রাস্তা-ঘাট, দোকান-পাট, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দির সহ শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন স্থাপনা। ক্রমান্বয়ে ফসলি জমি ভেঙে রাক্ষুসে নদীগুলো প্রায় গিলতে শুরু করেছে বড় বড় স্থাপনা।
অনেকেই ঘর-বাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছেন আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে। গৃহহারা পরিবারের লোকজন তাদের সহায়-সম্বল হারিয়ে এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অধিকাংশ মানুষ জীবিকার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছেন রাজধানী শহরে। ভয়ংকররূপী এ নদীগুলোর নজিরবিহীন তীব্র ভাঙণে শতাব্দীর প্রাচীন শত শত গ্রাম আজ উপজেলার মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। ইতিপূর্বে কিছু কিছু এলাকার বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ একাধিকবার স¤প্রসারণ করায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ক্ষতি হয়েছে কোটি কোটি টাকা। এখনও হুমকির মুখে পড়ছে উপজেলার বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধগুলো। ইতিমধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বেশ কয়েকটি গ্রাম।
উপজেলাটি বাংলাদেশের ভিতরে সবচেয়ে বড় কৃষিসমৃদ্ধ ও মৎস্যসমৃদ্ধ বানিজ্যিক এলাকা। এখানে ধান, আলু, তরমুজ, মরিচ, বাদাম, বিভিন্ন রকমের ডাল যেমন মুগ, মুশরী, মাসকালাই, বিভিন্ন প্রজাতির মাছ যেমন ইলিশ, কোড়াল, আইর, পাঙ্গাস, বোয়াল, রুই, কাতলা, মৃগেল, গ্রাসকার্প, সিলভারকার্প, পোমা, টেংরা, গাগরা, বাইলা, রূপচাঁদা, ভাটা, ফাইসা, রামছোচ, সিং, মাগুর, কৈ, গলদা চিংড়ি, বাগদা চিংড়ি, হরিণা চিংড়ি, কাঠালী চিংড়ি পাওয়া যায়। এছাড়া, এখানে আরও নাম না জানা অনেক রবিশস্য ও মাছ পাওয়া যায়। এখান থেকে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বঙ্গোপসাগরের গর্জন শোনা যায়। উপক‚লবর্তী উপজেলায় বিভিন্ন প্রাকৃতিক দূর্যোগ থাকা সত্তে¡ও এখানকার খাদ্যশস্য, রবিশস্য ও বিভিন্ন প্রজাতির মাছ দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা হয়। তাই দেশের স্বার্থে অদূর ভবিষ্যতে সমুদ্রের অতল গর্ভে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে উপজেলাটিকে রক্ষা করা প্রয়োজন।
সরেজমিনে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ ও অনুসন্ধান করে জানা যায়, লোহালিয়া নদীর ভাঙণের কবলে পড়ছে- উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের উত্তরে কলাগাছিয়া লঞ্চঘাট থেকে দক্ষিণে সোনামুদ্দি সিকদার বাড়ি পর্যন্ত তিন কিলোমিটার; আমখোলা ইউনিয়নের উত্তরে শ্যাকাঠীর খাল থেকে দক্ষিণে চিংগুরিয়া পর্যন্ত আড়াই কিলোমিটার এবং উত্তরে আমখোলা বাজার থেকে দক্ষিণে সূহরী বাজার পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার।
রামনাবাদ নদীর ভাঙণের কবলে পড়েছে- উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের উত্তরে গজালিয়া পুরাতন লঞ্চঘাট থেকে দক্ষিণে গজালিয়ার খাল পর্যন্ত এক কিলোমিটার; ডাকুয়া ইউনিয়নের উত্তরে গজালিয়ার খাল থেকে হোগলবুনিয়া, আটখালী ও ডাকুয়া গ্রামসহ দক্ষিণে ফুলখালী স্লুইজগেট পর্যন্ত দুই কিলোমিটার; গোলখালী ইউনিয়নের পূর্বে চরহরিদেবপুর থেকে পশ্চিমে হরিদেবপুর ফেড়ীঘাট পর্যন্ত দুই কিলোমিটার, উত্তরে গোলখালীর খেয়াঘাট থেকে দক্ষিণে নলুয়াবাগীর খাল পর্যন্ত সাড়ে চার কিলোমিটার এবং উত্তরে নলুয়াবাগী নসুখাঁর বাড়ি থেকে দক্ষিণে জব্বার সিকদার বাড়ি পর্যন্ত দুই কিলোমিটার; গলাচিপা সদর ইউনিয়নের উত্তরে চরখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে দক্ষিণে আগুনমুখা নদীর মোহনা পর্যন্ত চার কিলোমিটার।
আগুনমুখা নদীর ভাঙণের কবলে পড়েছে- উপজেলার গলাচিপা সদর ইউনিয়নের পশ্চিমে রামনাবাদ নদীর মোহনা থেকে পূর্বে বোয়ালিয়া স্লুইজগেট পর্যন্ত আড়াই কিলোমিটার; পানপট্টি ইউনিয়নের পশ্চিমে বোয়ালিয়া স্লুইজগেট থেকে পূর্বে পানপট্টি লঞ্চঘাট পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার।
বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর ভাঙণের কবলে পড়েছে- উপজেলার পানপট্টি ইউনিয়নের দক্ষিণে পানপট্টি লঞ্চঘাট তেকে উত্তরে সন্নিরবান হয়ে যোগীর হাওলা ট্রলারঘাট পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার; রতনদী তালতলী ইউনিয়নের দক্ষিণে যোগীর হাওলা ট্রলারঘাট থেকে বদনাতলী খেয়াঘাট হয়ে উত্তরে উলানিয়া বাজারের স্লুইজগেট পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার; ডাকুয়া ইউনিয়নের দক্ষিণে উলানিয়া বাজারের স্লুইজগেট থেকে উত্তরে গজালিয়ার খাল পর্যন্ত এক কিলোমিটার; চিকনিকান্দি ইউনিয়নের দক্ষিণে গজালিয়ার খাল থেকে উত্তরে দয়াময়ী কালি মন্দির পর্যন্ত তিন কিলোমিটার; বকুলবাড়িয়া ইউনিয়নের দক্ষিণে রনুয়ার বাজার থেকে উত্তরে পশ্চিম আলীপুরা বাজার পর্যন্ত আড়াই কিলোমিটার; চরকাজল ইউনিয়নের উত্তরে চরশিবা লঞ্চঘাট থেকে দক্ষিণে দক্ষিণ চরকাজলের জিনতলা বাজার পর্যন্ত সাত কিলোমিটার; চরবিশ্বাস ইউনিয়নের দক্ষিণে আমগাছিয়া লঞ্চঘাট থেকে উত্তরে আশ্রায়ন প্রকল্প পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার।
তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙণের কবলে পড়েছে- উপজেলা চরবিশ্বাস ইউনিয়নের দক্ষিণে ঘাসির চরের বনাঞ্চল থেকে উত্তরে পূর্ব চরবিশ্বাসের বেঁড়িবাঁধ পর্যন্ত তিন কিলোমিটার এবং দক্ষিণে চরবাংলা খেয়াঘাট থেকে উত্তরে উত্তরবাংলা পর্যন্ত দুই কিলোমিটার।
এ উপজেলার অর্ধশতাধিক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এ পঞ্চ নদীর ভাঙণের তান্ডবলীলার প্রতিযোগিতা চলছে। রাক্ষুসে এ নদীগুলোর করাল গ্রাস থেকে রক্ষা পায়নি ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, অচিরেই এ নদী ভাঙণ রোধ না করলে ভেঙ্গে পড়বে এখানকার অর্ধনীতি। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও অসংখ্য ডুবোচরের কারণে নদীগুলোর গতিপথ বদলে গিয়ে ভাঙণের কবলে পড়েছে পুরো উপজেলাটি। জরুরী ভিত্তিতে নদীশাসন না করলে উপজেলার মানচিত্রটাই একসময়ে পাল্টে যাবে।
এ বিষয়ে পটুয়াখালী জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাসানুজ্জামান জানান, নদীগুলোর ভাঙণ প্রতিরোধে বিপিসি (বøক) তৈরি করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে সমস্ত এলাকার ভাঙণরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Check Also

রাঙ্গাবালীতে করোনা ভাইরাস-জনসচেতনতায় লিফলেট বিতরণ

মাহামুদ হাসান, রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী)প্রতিনিধিঃ পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায় করোনা-ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে জনসচেতনতায় লিফলেট বিতরণ করা হয় …